চারে নয়, ভারত এখন ছ’নম্বরে: ডলার মূল্যায়নে পিছোল ভারতীয় অর্থনীতি

জাতীয় ডেস্ক, নয়াদিল্লি, ১১ আগস্ট, ২০২৬- বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির তালিকায় ভারতের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার বা IMF-এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ডলারের নিরিখে ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম। অর্থাৎ, আগে যে ভারতকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সেই অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।IMF-এর এপ্রিল ২০২৬-এর World Economic Outlook অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের nominal GDP প্রায় ৩.৯২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসাবে ভারতের আগে রয়েছে আমেরিকা, চিন, জার্মানি, জাপান এবং ব্রিটেন। ব্রিটেনের GDP প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং জাপানের প্রায় ৪.৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার হওয়ায় ভারত তাদের পিছনে চলে গিয়েছে। তবে ভারতের অর্থনীতির প্রকৃত বৃদ্ধি থেমে গিয়েছে—এমনটা এই র‌্যাঙ্কিং থেকে বলা যায় না। কারণ এখানে যে হিসাব করা হচ্ছে, তা nominal GDP বা বর্তমান মূল্যে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে। ফলে কোনও দেশের নিজস্ব মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ওঠানামা এই তালিকায় বড় প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারতের অবস্থান নেমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল টাকার তুলনায় মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হওয়া এবং ভারতীয় মুদ্রার দুর্বলতা। একটি দেশের GDP স্থানীয় মুদ্রায় বাড়লেও সেই অর্থ যদি তুলনামূলক দুর্বল বিনিময় হারে ডলারে রূপান্তর করা হয়, তা হলে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে GDP-র ডলার মূল্য কম দেখা যেতে পারে। IMF-এর হিসাবেও ভারতের র‌্যাঙ্কিং পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই বিনিময়মূল্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি ভারতের GDP হিসাবের পদ্ধতি ও পরিসংখ্যানগত সংশোধনও সামগ্রিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলেছে। ফলে শুধুমাত্র ‘চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ’—এই পরিবর্তন দেখে ভারতীয় অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতিকে বিচার করা ঠিক হবে না। IMF-এর হিসাবে ২০২৫ সালে ভারতের nominal GDP প্রায় ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় অর্থনীতির সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও ডলারের নিরিখে ভারতের অবস্থান কিছুটা পিছিয়েছে। তবে IMF-এর ২০২৬ সালের হিসাব আরও আশাব্যঞ্জক। চলতি বছরে ভারতের nominal GDP প্রায় ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনীতির মোট আকার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও অন্যান্য দেশের অর্থনীতির বৃদ্ধি ও মুদ্রার বিনিময়মূল্যও একই সঙ্গে র‌্যাঙ্কিংকে প্রভাবিত করবে। সংসদে উপস্থাপিত তথ্যেও IMF-এর এই মূল্যায়নের উল্লেখ রয়েছে। অর্থ মন্ত্রকের তরফে ভারতের অর্থনীতির আকার ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার কয়েকটি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরা হয়েছে। ভারত এখনও বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির অন্যতম। পরিষেবা ক্ষেত্র, উৎপাদন, পরিকাঠামো বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা—এই ক্ষেত্রগুলিকে ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, উৎপাদন-ভিত্তিক আর্থিক উৎসাহ প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সহায়তা এবং রফতানি বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে IMF-এর নতুন হিসাব প্রকাশিত হওয়ায় সেই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অর্থনীতির র‌্যাঙ্কিং কোনও স্থায়ী তালিকা নয়। দেশগুলির GDP, মুদ্রার বিনিময়মূল্য, মূল্যস্ফীতি, পরিসংখ্যানগত সংশোধন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তনের সঙ্গে এই অবস্থানও বদলাতে পারে। IMF-এর বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের nominal GDP প্রায় ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। ফলে সামনের বছরগুলিতে ভারতের অর্থনীতি ফের বিশ্বের শীর্ষ পাঁচে ঢোকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু GDP-র আকার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির উপরও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও যদি পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হয়, তাহলে সেই বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছবে না। তাই আগামী দিনে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতির তালিকায় ভারতের অবস্থান সাময়িকভাবে ষষ্ঠ হলেও দেশের অর্থনীতির আকার ও বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ রয়েছে। এখন ভারতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হল দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে আরও বেশি কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে রূপান্তর করা

খবরটি শেয়ার করুন