নিজস্ব সংবাদদাতা | কলকাতা, ১১ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করার ডাক দিলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-এর সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। মঙ্গলবার কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরি হলে আয়োজিত ছাত্র-যুব কর্মসূচিতে তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, ছাত্রদের অধিকার, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং উচ্চশিক্ষায় সরকারি দায়িত্বের প্রশ্ন। অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল—‘Education is NOT for SALE’ এবং ‘STOP PRIVATISATION OF EDUCATION’।
AISA-র এই কর্মসূচি মূলত বৃহত্তর ছাত্র-যুব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিনিধিদের এক জায়গায় আনার উদ্যোগ হিসেবেও সামনে আসে। কর্মসূচিতে বাম ছাত্র সংগঠনগুলির পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিভিন্ন ছাত্র-যুব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি ছিল। AISA-র পক্ষ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার বার্তা দেওয়া হয়। সভায় বক্তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের প্রশ্ন। তাঁদের অভিযোগ, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষার খরচ ক্রমশ বাড়তে থাকলে আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সুযোগের পরিসর সংকুচিত হয়। ফলে শিক্ষার অধিকার ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির বিরোধিতা করেই ‘Education is Not for Sale’ স্লোগান সামনে আনা হয়। AISA-র বক্তব্য, শিক্ষা কোনও বাণিজ্যিক পণ্য নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ ও মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা। জাতীয় স্তরের পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে সংগঠনের আপত্তিও এই আন্দোলনের অংশ।নেহা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন, শুধু কোনও একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আন্দোলন শেষ করার প্রশ্ন নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিকেও আন্দোলনের প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কলকাতার কর্মসূচির আগে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েও নেহা বরা পশ্চিমবঙ্গের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন চালুর দাবি তোলেন। রাজ্যের বহু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়মিত না হওয়ায় ছাত্রদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে বলে তাঁর বক্তব্যের সূত্রে উঠে আসে। AISA-র মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করার গণতান্ত্রিক অধিকার থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন পুনরায় চালুর দাবিকে তারা বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছে। রামমোহন লাইব্রেরির কর্মসূচিতে শুধু AISA-র প্রতিনিধিরাই ছিলেন না। বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র-যুব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বক্তাদের উপস্থিতি ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন SFI-এর রাজ্য সভাপতি প্রণয় কার্য্যী এবং DSO-র রাজ্য সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়। সাম্প্রতিক আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং জুনিয়র ডাক্তার ফ্রন্টের অন্যতম নেতৃত্ব দেবাশিস হালদারও বক্তব্য রাখেন। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা মঞ্চের মুখ মেহবুব মণ্ডলের উপস্থিতিও ছিল।
ফলে কর্মসূচিটি কেবল AISA-র সাংগঠনিক সভা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিভিন্ন ছাত্র, যুব ও নাগরিক আন্দোলনের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের সম্ভাবনাও সেখানে তুলে ধরা হয়। উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা নেহা বরা ছাত্রজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন উত্তরবঙ্গে। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি উত্তরবঙ্গে আসেন এবং শিলিগুড়িতে মাধ্যমিক, একাদশ ও উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা করেন। রামমোহন লাইব্রেরির সভায় নিজের সেই বাংলার সঙ্গে সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলার মাটিতে থাকার সময়ই তিনি চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা ও অরুন্ধতী রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন। সেই সময় থেকেই দক্ষিণপন্থার থেকে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বামপন্থী রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। কর্মসূচিতে SFI-এর পক্ষ থেকে নেহা বরার হাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছবি তুলে দেওয়া হয়। ছবিতে লেখা ছিল রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত পংক্তি—**‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ এবং ওই ছবি হাতে নিয়েই নেহা চলমান ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্যে ভয়কে জয় করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান উঠে আসে। তিনি দাবি করেন, শিক্ষা ও ছাত্র-যুবদের অধিকার নিয়ে চলমান আন্দোলন প্রতিদিন নতুন শক্তি অর্জন করছে। সভায় পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গও উঠে আসে। নেহা বলেন, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক হতাশা থেকেই রাজ্যে বিজেপির উত্থানের পথ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে বাংলার পুনরুত্থান বিজেপির হাত ধরে হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও AISA-র অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা দেখা যায়। কলকাতার কর্মসূচির আগে ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলনের একটি সংহতি কর্মসূচিতে নেহা বরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তাঁর গায়ে কালি ছোড়ার ঘটনা ঘটেছিল বলে সংবাদসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। কলকাতায় তাঁর কর্মসূচি ঘিরেও নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক ছিল আয়োজকপক্ষ। রামমোহন লাইব্রেরির কর্মসূচি চলাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে পোস্টারও দেখা যায়। ফলে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানা গিয়েছে। সব মিলিয়ে কলকাতার এই কর্মসূচি থেকে AISA-র পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—শিক্ষার বেসরকারিকরণ বন্ধ করা, পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি এবং ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
AISA-র বক্তব্য, শিক্ষাকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়বে। তাই সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। রামমোহন লাইব্রেরির সভা সেই বৃহত্তর আন্দোলনেরই একটি পর্ব বলে আয়োজকদের বক্তব্য। মঙ্গলবারের কর্মসূচির পর নেহা বরার কলকাতা সফরের পরবর্তী কর্মসূচি ছিল বরাহনগরের ISI-তে। এরপর তাঁর দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
