আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১৪ আগস্ট ২০২৬
লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে এখনও জোরকদমে চলছে অভিযান। সোমবার আঘাত হানা শক্তিশালী ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ২৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩,৮০০-র বেশি মানুষ। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারি হিসাবে আরও ৩৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ভূমিকম্পের প্রাথমিক পর্যায়ে নিখোঁজের সংখ্যা ২,৭০০-র বেশি বলে বিভিন্ন নাগরিক-তালিকা ও ওয়েবসাইটে উঠে এসেছিল। সেই সময় অন্তত ২২৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে প্রশাসনের যাচাই ও উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজের হিসাব সংশোধিত হয়েছে। রিখটার স্কেলের মাত্রা ৭.৪ হিসাবে সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার কিছু পরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। কালী, পেরেইরা, মানিজালেস এবং কুইবদো-সহ একাধিক শহরে ভবন ধসে পড়ে, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রাথমিক হিসাবেই ১০ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে পানীয় জল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে উদ্ধারকারী দল, দমকলকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে রয়েছেন কি না, তা জানতে উদ্ধারকারীরা অনেক জায়গায় সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রেখে শব্দ শোনার চেষ্টা করছেন। কালী শহরে এখনও নয়টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার অভিযান সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। তবে ভূমিকম্পের পর গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমশ কমছে। তবু উদ্ধারকাজ থামছে না। ইতিমধ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। কালীতে ভূমিকম্পের প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর একটি ধসে পড়া ভবন থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। একটি শিশুকেও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছাকাছি কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল। কয়েকটি এলাকায় রাস্তা ধসে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে দেরি হয়েছে। কোথাও কোথাও পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ভূমিকম্পের পর একাধিক আফটারশক বা পরাঘাতও রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে ধসে পড়া ভবনে উদ্ধারকাজ চালানো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকারীদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশাসনকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা-র জন্য দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই সবচেয়ে বড় জাতীয় সংকটগুলির একটি। সরকার জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনী, পুলিশ, প্রকৌশলী, দমকল ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলকে কাজে নামিয়েছে। প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন তিনটি—ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত পরিবারগুলির কাছে দ্রুত খাদ্য, জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া। কলম্বিয়ার বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি দুর্যোগ সহায়তা দল পাঠিয়েছে। মেক্সিকোও অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী , চীন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছ থেকেও উদ্ধার সরঞ্জাম, অর্থ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছতে শুরু করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর কলম্বিয়ার সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর ও পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলিতে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে উদ্ধারকারীদের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কেউ জীবিত থাকতে পারেন—এই আশাতেই ঝুঁকি নিয়ে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
সূত্র: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম
