নিজস্ব সংবাদদাতা | কলকাতা, ১০ আগস্ট ২০২৬
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট-রাজের দাপট কমেছে। তার প্রভাব আবাসন নির্মাণ শিল্পেও পড়তে পারে বলে মনে করছে নির্মাণশিল্পের সংগঠন ক্রেডাই (CREDAI)। সংগঠনের দাবি, নির্মাণ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ কমলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে আবাসনের দামও কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি বর্গফুটে মোটামুটি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন শিল্পকর্তাদের একাংশ। সোমবার ক্রেডাই ওয়েস্ট বেঙ্গলের চেয়ারম্যান সুশীল মোহতা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পরে তোলাবাজি-সিন্ডিকেটের দাপট কমেছে। তাই সস্তা হচ্ছে বাসস্থান। দাম কমানোর সুযোগ যতটা থাকবে, ততটাই আমরা কমাব ক্রেতাদের স্বার্থে।’’
তবে বাস্তবে তোলাবাজি বা সিন্ডিকেটের কারণে ঠিক কতটা অতিরিক্ত খরচ হত এবং বর্তমানে সেই খরচ কতটা কমেছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন মহলের বক্তব্য, নির্মাণ খাতে সব ধরনের খরচ একসঙ্গে বিবেচনা না করলে আবাসনের চূড়ান্ত দাম কতটা কমবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ক্রেডাই কলকাতা চ্যাপ্টারের সদ্য প্রাক্তন সভাপতি সিদ্ধার্থ পানসারি-র দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরে পশ্চিমবঙ্গে ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ২–৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, আবাসনের দাম নির্ধারণে একাধিক উপাদান কাজ করে। ফলে শুধুমাত্র তোলাবাজি বা সিন্ডিকেটের খরচ কমেছে বলেই মোট দাম কতটা কমবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ক্রেডাইয়ের হাওড়া-হুগলি শাখার সভাপতি তমাল ঘোষাল বিষয়টিকে আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নির্মাণ খরচ কমলেও বালি, সিমেন্ট, টাইলস, রড-সহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। ফলে সমস্ত খরচের হিসাব করার পরই বোঝা যাবে, শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের উপর কতটা আর্থিক প্রভাব পড়বে।
আবাসন শিল্পের পাশাপাশি নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন নিয়েও এ দিন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন সুশীল মোহতা। তাঁর দাবি, তারাতলায় নির্মীয়মাণ একটি গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনার পর কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় ৭০৬টি প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ক্রেডাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই প্রকল্পগুলির মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০০টি প্রকল্প ছাড়পত্র পেয়েছে। আরও প্রায় ২৫০টি প্রকল্প ১৫ আগস্টের মধ্যে ছাড়পত্র পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-র বক্তব্যেরও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রশাসনিক যাচাইয়ে ২৬টি প্রকল্পে গরমিল ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আরও ১১টি প্রকল্প এখনও সরকারের কাছে আবেদনই করেনি। সুশীল মোহতার দাবি, যেসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে সমস্যা বা গরমিল ধরা পড়েছে, তার মধ্যে ক্রেডাইয়ের সদস্য কোনও সংস্থা নেই।
আবাসন শিল্পের প্রতিনিধিদের মতে, নির্মাণ ব্যবসায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অনানুষ্ঠানিক খরচের অভিযোগ ছিল। নতুন পরিস্থিতিতে সেই খরচ কমলে তার সুফল ক্রেতাদের দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সময়ে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি, জমির দাম, ঋণের সুদ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ক্রেডাই কর্তাদের বক্তব্য, রাজ্যে আইনের শাসন ফিরে আসার বার্তা আবাসন শিল্পের কাছে ইতিবাচক। প্রশাসনিক অনুমোদন দ্রুত পাওয়া গেলে এবং নির্মাণকাজে অযাচিত খরচ কমলে নতুন প্রকল্পের গতি বাড়তে পারে। তার ফলে ভবিষ্যতে আবাসনের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি দাম নিয়েও প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রতি বর্গফুটে ১০০–২০০ টাকা বা মোট আবাসনমূল্য ২–৪ শতাংশ কমবে কি না, তা নির্ভর করবে জমির মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রমিক খরচ, সরকারি ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের সামগ্রিক হিসাবের উপর। তাই ক্রেডাইয়ের এই সম্ভাব্য দাম কমার পূর্বাভাসকে আপাতত শিল্পমহলের প্রত্যাশা হিসেবেই দেখা হচ্ছে
